গত সোমবার রাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। প্রথমে এর উৎপত্তিস্থল ঢাকা বলা হলেও পরে আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। সৌভাগ্যবশত এতে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি কেবল ক্ষয়ক্ষতি না হওয়ায় স্বস্তি নিয়ে বসে থাকব, নাকি এটিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করব? গত কয়েক বছরে বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রায়ই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কম্পন অনুভূত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, বাংলাদেশ বিশেষ করে ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চল ভূতাত্ত্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। দেশের পূর্বাঞ্চল, সিলেট অঞ্চল, চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকা এবং মধুপুর ফল্টসহ বিভিন্ন সক্রিয় ভূ-চ্যুতির উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে যার ফলে বড়ো ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা মোটেই উড়িয়ে দেয়া যায় না।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভূমিকম্পের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা যতটা প্রয়োজন, বাস্তবে তার অনেক ঘাটতি রয়েছে। আমাদের অধিকাংশ মানুষ এখনও জানেন না ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে কিংবা কীভাবে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত কিংবা আবাসিক ভবনে নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণের সংস্কৃতি এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বড় কোনো দুর্যোগের মুখোমুখি হলে আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা ও ভুল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

শুধু নাগরিক সচেতনতার অভাবই নয়, নগর পরিকল্পনার দুর্বলতাও বড় উদ্বেগের কারণ। রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য বড় শহরে অসংখ্য ভবন নির্মিত হয়েছে যথাযথ ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা ও মানদণ্ড অনুসরণ না করে। অনেক পুরোনো ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব, সরু সড়ক, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং উন্মুক্ত স্থানের সংকট সম্ভাব্য উদ্ধার কার্যক্রমকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলতে পারে। একটি বড় ভূমিকম্প শুধু ভবন ধসের ঝুঁকিই সৃষ্টি করবে না, বরং অগ্নিকাণ্ড, গ্যাসলাইন বিস্ফোরণ, বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো বহুমাত্রিক সংকটও ডেকে আনতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ভূমিকম্প-সহনশীল নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুন ভবন নির্মাণে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সংস্কার বা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। তৃতীয়ত, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স, সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি।

এর পাশাপাশি আগাম পুনর্বাসন পরিকল্পনাও এখন সময়ের দাবি। বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর লাখো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়তে পারেন। কোথায় অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হবে, কীভাবে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে, কীভাবে শিশু, নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে পূর্বপ্রস্তুতি থাকতে হবে। দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কৌশল দুর্যোগের আগেই প্রস্তুত করতে হয়। সংকটের মুহূর্তে পরিকল্পনা তৈরির সময় থাকে না।

গণমাধ্যম,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার, মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং জনসম্পৃক্ত কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি দুর্যোগ-প্রস্তুত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। জাপান, তুরস্ক কিংবা অন্যান্য ভূমিকম্পপ্রবণ দেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, প্রস্তুতি ও সচেতনতা হাজারো প্রাণ রক্ষা করতে পারে। মনে রাখতে হবে, ভূমিকম্প কখন হবে তা নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার প্রস্তুতি নেওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটি হয়তো বড় কোনো বিপর্যয় ডেকে আনেনি, কিন্তু এটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এই সংকেত উপেক্ষা করা হবে আত্মঘাতী। দুর্যোগ আসার পর নয়, দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা হলো সচেতনতা, পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি। বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে এটিকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।