॥ বেতুল দোগান আক্কাস ॥

যেহেতু প্রতিটি উপসাগরীয় রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা শক্তিশালী করতে চায়, তাই উদীয়মান এই নিরাপত্তা নীতিতে ন্যাটো একটি শক্তিশালী উপাদান হবে কিনা, তা নির্ধারণে ন্যাটোর আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৯৩ সালে ততকালীন ন্যাটো মহাসচিব ম্যানফ্রেড ওয়ার্নার যেমন বলেছিলেন : “সোভিয়েত কমিউনিজমের পতন আমাদের একটি আপাতবিরোধী পরিস্থিতিতে ফেলেছে : হুমকি কমেছে, কিন্তু শান্তিও কমেছে।” স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব রাজনীতির কাঠামোগত উদ্বেগ ছিল মার্কিন আধিপত্যবাদী শক্তির একটি আধুনিক সংস্করণের অধীনে বিশ্বের স্থিতাবস্থা কীভাবে নতুন করে পরিচালনা করা যায়। তবে, চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারির সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক ভূগোলে নিহিত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে, আর তা হলো, ইরানের পক্ষ থেকে সরাসরি সামরিক আক্রমণের বাস্তবতা। ১৯৭৯ সাল থেকে ইরানের সামরিক অবস্থান আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি সম্ভাব্য হুমকি এবং ইরানের উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এই ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে নানাভাবে প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখে আসছে।

২৮শে ফেব্রুয়ারির আগের উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো বেশ কিছু নির্ধারক বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। এটি এমন এক কাঠামো যেখানে আঞ্চলিক শান্তি রক্ষায় ন্যাটো কেবল সীমিত ভূমিকা পালন করেছে। প্রথমত, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সামরিক নিরাপত্তা সক্ষমতা, যার মধ্যে রয়েছে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা অভিযান, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য প্রচলিত ও অপ্রচলিত সম্পদ, যার বেশিরভাগই আমদানিকৃত। এই নিরাপত্তা চাহিদাগুলো ১৯৯১ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব এবং কাতারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রধান অ-ন্যাটো মিত্র (MNNA) হিসেবে মনোনীত করেছে। সময়ের সাথে সাথে, তারা ইউরোপীয় পক্ষ, চীন, তুরস্ক এবং এমনকি ইসরাইলের সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য এনেছে।

তার পরও আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কোনোটিই নিজের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তাই বর্তমান প্রবণতা হলো বৃহত্তর পরিসরের বহিরাগত শক্তির সাথে সহযোগিতা করা এবং একই সাথে জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ করা, যার দৃষ্টান্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কাতারের বিভিন্ন উদ্যোগে দৃশ্যমান।

ইস্তাম্বুল সহযোগিতা উদ্যোগ : দ্বিতীয়ত, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ন্যাটো নিরাপত্তা ছাতার অধীনে এসেছে তুলনামূলকভাবে দেরিতে, কারণ ইস্তাম্বুল সহযোগিতা উদ্যোগ (আইসিআই) কেবল ২০০৪ সালে চালু হয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন এবং কুয়েত আইসিআই-এর সদস্য এবং ন্যাটোর নীতিমালার সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তবে, সৌদি আরব এবং ওমান এই উদ্যোগের বাইরে। এই অঞ্চলে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর বিষয়ে, এই দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ভূমিকা বিবেচনায়, তাদের এই অনুপস্থিতি ন্যাটোর জন্য প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে : ন্যাটো জোটের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কোনো ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেই।

আইসিআই ছয়টি মূল নীতির উপর ভিত্তি করে গঠিত : বৈষম্যহীনতা, স্বাতন্ত্র্য, দ্বিমুখী সম্পৃক্ততা, চাপিয়ে না দেওয়া, বৈচিত্র্য এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সাথে পরিপূরকতা। ঠিক যেমন ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছিল এবং ন্যাটোর সাথে সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল, তেমনি বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনাও ন্যাটো ৩.০ নীতির সাথে সঙ্গতি রেখে সহযোগিতার আরেকটি নতুন অধ্যায় উন্মোচন করতে পারে। তথাপি, এখন পর্যন্ত বাস্তবে আইসিআই-এর অধীনে প্রস্তাবিত ন্যাটো কার্যক্রমের ১৫ শতাংশেরও কম বাস্তবায়িত হয়েছে। আফগানিস্তান, কসোভো, লিবিয়া এবং সিরিয়ায় ন্যাটোর যেসব কার্যক্রম চলমান তাতে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের ভূমিকা প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সীমিতই রয়ে গেছে।

স্বতন্ত্র সহযোগিতা কর্মসূচি : উপসাগরীয় নিরাপত্তায় ন্যাটোর ভূমিকার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দিকে ফিরে তাকালে, ২০০৮ সালে আরেকটি মাইলফলক অর্জিত হয়েছিল, যখন চারটি উপসাগরীয় রাষ্ট্র নিয়ে ন্যাটোর বৈঠক আয়োজনের মাধ্যমে এই অংশীদারিত্ব একটি বহুপাক্ষিক কাঠামোতে প্রসারিত হয়। জিসিসির সব দেশের সাথে সহযোগিতার চ্যালেঞ্জ স্বীকার করে, ২০০৯ সালের স্ট্রাসবার্গ/ কেল শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে খোলাখুলিভাবে ঘোষণা করা হয় যে, ন্যাটো উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর জন্য আলাদা সহযোগিতা কর্মসূচি (আইসিপি) চেয়েছিল।

উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোটের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৪ সালে ইস্তাম্বুল সহযোগিতা উদ্যোগ (আইসিআই) প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর কাঠামোর অধীনে অর্জিত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিতে আমরা আনন্দিত। রাজনৈতিক আলোচনা ও বাস্তব সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা আমাদের আইসিআই অংশীদারদের সমন্বিত সহযোগিতা কর্মপরিকল্পনা (আইসিপি) গড়ে তুলতে উতসাহিত করি। ন্যাটোর বিভিন্ন কার্যক্রম ও মিশনে আইসিআই অংশীদাররা যে সমর্থন দেন আমরা তাকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করি।

আইসিপি’র উপর এই গুরুত্বারোপ একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে, ন্যাটো আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সাথে সহযোগিতার জন্য একটি যৌথ কাঠামো তৈরির কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো স্বীকার করে। এই বাস্তবতা এমন নীতিগত প্রভাব তৈরি করেছিল যা দায়িত্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোকে পরস্পর থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। বলা যেতে পারে, সংযুক্ত আরব আমিরাত জোটের সবচেয়ে উতসাহী অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং ২০১২ সালে ন্যাটো সদর দপ্তরে একটি স্থায়ী মিশন প্রতিষ্ঠা করেছে। কুয়েতকে উপসাগরীয় অঞ্চলে ন্যাটোর আরেকটি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, কারণ এটি আইসিআই আঞ্চলিক কেন্দ্রের আয়োজক এবং ন্যাটোর সাথে ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রথম উপসাগরীয় রাষ্ট্র, যা ন্যাটোর রসদ সরবরাহের জন্য তার ভূখ- ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

যদিও একটি উপ-অঞ্চল হিসেবে জিসিসি সাধারণ ও উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, নিরাপত্তা বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো একীভূত ধারণা নেই। এর অর্থ এ-ও যে, ন্যাটোর কাছে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যাশাও ভিন্ন। উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করার ক্ষেত্রে এই জোট ভূমিকা পালন করতে পারে, বিশেষ করে যেহেতু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতগুলো এই ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করে দিয়েছে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ভূমিকা একটি সমাধানযোগ্য বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে, কারণ ন্যাটো-মার্কিন দায়ভার ভাগাভাগির ব্যবস্থা এখনও অস্পষ্ট। অধিকন্তু, জিসিসি-সম্পর্কিত এই বাধাগুলোর বাইরেও, ইউক্রেনের যুদ্ধ চলমান থাকায় ন্যাটোর কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলো শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যের উপর কেন্দ্রীভূত নয়।

ন্যাটোর আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনের গুরুত্ব : তুরস্কের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেকি লেভেন্ট গুমরুকচু ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটে দেওয়া তাঁর ভাষণে যেমনটি ঘোষণা করেছেন, এবারের আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনে ইস্তাম্বুল সহযোগিতা উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী চারটি উপসাগরীয় দেশের সাথে একটি বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।

বিদ্যমান সহযোগিতা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনা করে, আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলন কি উপসাগরীয় নিরাপত্তার নতুন রূপ দিতে পারে? উভয় পক্ষেই কাঠামোগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও, বর্তমান আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও কার্যকর নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং উন্নততর দায়িত্ব-বণ্টন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। যেহেতু প্রতিটি উপসাগরীয় রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে চাইছে, তাই এই উদীয়মান নিরাপত্তা নীতিগুলিতে ন্যাটো একটি শক্তিশালী উপাদান হয়ে উঠবে কিনা তা নির্ধারণের জন্য এই শীর্ষ সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো সামুদ্রিক নিরাপত্তা। এক্ষেত্রে ন্যাটোর যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং জোটের নথিপত্রে বারবার জোর দেওয়া হয়েছে যে, ন্যাটো উপসাগরীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তায় দায়িত্ব ভাগাভাগিতে অবদান রাখতে পারে, শুধু লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার মাধ্যমেই নয়, বরং জাহাজ ও তেল ট্যাংকারের ওপর হামলার ফলে সৃষ্ট সামুদ্রিক দূষণ প্রতিরোধ করে পরিবেশ সুরক্ষায় অবদান রাখার মাধ্যমেও।

সামুদ্রিক নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর একটি উপেক্ষিত দিক। যদিও ইরান বা হুথিদের হামলার সম্ভাবনা বছরের পর বছর ধরে আঞ্চলিক আলোচ্যসূচিতে রয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনীর উপর নির্ভরতাই উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিরোধ কৌশলের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে। ন্যাটো উপসাগরীয় দেশগুলোকে শুধু প্রণালীটির জন্য একটি আরও প্রাতিষ্ঠানিক যৌথ সামুদ্রিক কাঠামো প্রস্তাব করার মাধ্যমেই নয়, বরং আরও প্রশিক্ষণ এবং অভিযানগত সহযোগিতা ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় সামুদ্রিক কৌশল সমর্থন করেও সহায়তা করতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সাথে বর্তমান সংঘাতকে আরও আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিকভাবে সমর্থিত প্রতিরোধ কাঠামোতে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যেই পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্সের ছত্রছায়ায় বাহরাইনে একটি সমন্বিত সামুদ্রিক অভিযান কেন্দ্র পরিচালনা করে। যদি এই কাঠামোটি ন্যাটোর সাথে আরও কার্যকরী সহযোগিতার মাধ্যমে পরিপূরিত হয়, তবে এই উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগগুলো তাতপর্য।পূর্ণভাবে আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়

(৮ জুলাই আনাদলু নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত নিবন্ধ। অনুবাদ: মুজতাহিদ ফারুকী