দেশে কোন কিছু ঘটলেই উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে তার এজন্য সরকারকে দায়ি করা হয়। এমনকি আমলা বা আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কোন অপরাধ করলে তার পুরো দায় নিতে হয় সরকারকে। একশ্রেণির অসাধু, নৈতিকতাহীন, দলবাজ ও অযোগ্য সরকারি কর্মকর্তা অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের সকল অপকর্মের দায় চাপিয়ে দেন সরকারের ওপর। ভাবটা এমন যে, তারা সবকিছুই করেন সরকারের অঙ্গুলী হেলনে। নিজেরা ধোয়া তুলসীপাতা। এ প্রসঙ্গে একজন সাবেক মন্ত্রীর বক্তব্য বেশ চমকপ্রদ।
তিনি এক জনসভায় খেদোক্তি করেই বলেছিলেন, ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে মন্ত্রীদেরকে দলে দলে জেলে যেতে হয়। দণ্ডিতও হন অনেকে। কিন্তু অধরা থেকে যান সকল অপকর্মের হোতা একশ্রেণির অসাধু, মূল্যবোধহীন, দলবাজ ও অযোগ্য সরকারি কর্মকর্তা। তার এ বক্তব্য কিছুটা হলেও বিরক্তিকর মনে হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন পর তার কথা এখন কেন জানি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মতই মনে হচ্ছে। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর যে সরকারের খবরদারি নেই এমন নয়। সেগুলো প্রায় ক্ষেত্রেই সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে হয়ে থাকে। কিন্তু ‘ইচকে চোর’, ‘ফিচকে চোর’ ও ‘সিঁদেল চোর’ ধরার ক্ষেত্রে সরকারের কোন হস্তক্ষেপ আছে বলে মনে করার কোন সুযোগ নেই। সঙ্গত কারণেই আমলার দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করায় মন্ত্রণালয় কক্ষে সাংবাদিক নাজেহাল ও পুলিশ কর্তৃক পথচারির পকেটে মাদক ঢুকিয়ে দিয়ে হয়রানির সাথে সরকারের কোন সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। এমনটা ভাবাও এক ধরনের মানসিক বৈকল্যই।
নিকট অতীতে এক অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে সচিবালয়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের অফিস কক্ষে। সেখানে এক সাংবাদিককে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রেখে নানা ভাবে নাজেহাল ও লাঞ্চিত করার ঘটনা ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস এক্ট’এ মামলাও দেয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অফিসের গোপনীয় নথি চুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো সরকারের গোপন নথি কী অফিসে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়, না গোপনে সংরক্ষণ করা হয় ? সেখানে একজন বহিরাগত সাংবাদিক কীভাবে নথি চুরি করলেন আর সে সময় অফিসের কর্মকর্তা, কর্মচারি বা নিরাপত্তারক্ষীরা কোন কাজে ব্যস্ত ছিলেন তা কোন সুস্থ্যবিবেক সম্পন্ন মানুষের কাছে বোধগম্য নয়। বিষয়টি রীতিমত শাক দিয়ে মাছ ঢাকা নয় কী ?
এ পুরো প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র আমলা। পরে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে দেওয়া হয়েছে বলে শুনেছি। তার নৈতিকতা ও দাম্পত্য জীবন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেক অকথা-কুকথা প্রকাশ পেয়েছে। সত্য-মিথ্যা আল্লাহ মালুম। এ ফিমেল আমলার বিরুদ্ধেই উক্ত সাংবাদিকের গলা চেপে ধরার অভিযোগ গণমাধ্যমে সচিত্র প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে অভিযুক্তকে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের সম্মুখীন করাই অধিক যুক্তিযুক্ত বা উত্তম সমাধান ছিল। কিন্তু তা না করে দীর্ঘ সময় তাকে অফিসে আটক রেখে বিভিন্নভাবে নাজেহাল একশ্রেণির আমলাদের শুধু অপেশাদারীই নয় বরং ফৌজদারি অপরাধও। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করায় সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম লাঞ্চিত ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। নথি চুরি অভিযোগ কারো কাছেই বিশ্বাসযোগ্য করতে পারেন নি সংশ্লিষ্টরা। মূলত, নিজের অপকর্ম ঢাকতে এ ধরনের কল্পকাহিনী ও নসিমন উপাখ্যান তৈরি হয়েছে বলেই আত্মসচেতন মানুষ মনে করেন।
আমলা কর্তৃক সাংবাদিক নিগ্রহের ঘটনা এটিই প্রথম নয় বরং এর আগেও এধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। সরকারি কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন না করায় সাংবাদিকরা অপদস্তের শিকার হয়েছেন। অথচ সংবিধান অনুযায়ি তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমলারাই সাধারণ মানুষকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করার রেওয়াজ রয়েছে। উল্লেখ, কুড়িগ্রামের বাংলা ট্রিউবিউনের সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে মধ্যরাতে তার বাড়ি থেকে তুলে এনে কথিত মাদক ও গাঁজা রাখার অপরাধে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা দেয়ার ঘটনা সারাদেশেই বেশ চাঞ্চলের সৃষ্টি করেছিল। রিগ্যানকে শুধু সাজাই দেয়া হয়নি বরং মোবাইল কোর্ট সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট এবং তার সঙ্গীয় লোকজনরা তাকে ঘরের দরজা ভেঙে ব্যাপক মারধর করার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এনে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাজা দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ পুরো প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলেন সাবেক জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন। এ ঘটনায় কুড়িগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায়, তাকে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসন থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এ অপরাধে তিনি শাস্তিও পেয়েছিলেন এবং তাকে জেলেও যেতে হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট তাকে ক্ষমা করেছেন বলে জানা গেছে।
সাংবাদিক রিগ্যানের অপরাধ তিনি জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন খবরাখবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করতেন। জেলা প্রশাসক একটি পুকুরের নাম নিজের নামে অন্যায়ভাবে করতে চেয়েছিলেন, যা তিনি করতে পারেন না। পুকুরের নামকরণের খবরাখবর সাংবাদিক রিগ্যান সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করায় ডিসির রোষাণলে পড়েন বলে জানা যায়। আর এতেই তিনি ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার হন।
একশ্রেণির আমলারা জনপ্রশাসনে নিয়োগ পেয়ে ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। আমরা ইতোপূর্বে ইউএনও কর্তৃক ব্যাংক কর্মকর্তাকে মারধর, মাস্ক ব্যবহার না করার অপরাধে ম্যাজিষ্ট্রেট কর্তৃক পিতার বয়সী ব্যক্তিকে কান ধরানো এবং এসিল্যাণ্ডকে ‘দিদি’ সম্বোধন করায় মাছ বিক্রেতাকে লাথি মারার ঘটনা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। এসব পুরো আমলাতন্ত্রকেই বিতর্কিত করেছে। আইন অনুযায়ি আমলারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হলেও তারা নিজেদেরকে জনগণের প্রভূ বলেই মনে করেন। ফলে পুরো আমলাতন্ত্রই এখন আসামীর কাঠগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। এদের কারণেই ‘সিভিল সার্ভিস’কে ‘Cattle Service’ বলে বিদ্রুপ করতে শোনা গেছে খোদ একজন অপসরপ্রাপ্ত আমলাকেই। অথচ আমলাতন্ত্রে সৎ, যোগ্য, মেধাবী, চৌকস ও প্রজ্ঞাবান কর্মকর্তার সংখ্যাই বেশি। কিন্তু তারা অসৎপ্রবণ স্বল্পসংখ্যক কর্মকর্তার কাছে জিম্মি। মূলত এসব অসাধু কর্মকর্তারা ক্ষমতাসীন দলের লেজুরবৃত্তি করে অতিমাত্রায় ক্ষমতাধর হয়ে অপকর্ম করেন নির্দিধায়।
মূলত, এক শ্রেণির আমলা দায়িত্ব পালনে কোনভাবেই পেশাদারিত্ব ও আইন-কানুনের ধার ধারেন না। এদের দায়িত্ব পালনে চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও দায়িত্বহীনতা লক্ষ্য করা যায়। এমনই এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছিলো নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায়। গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, প্যানডেমিকের সময় সরকারি ত্রাণসহায়তা চেয়ে ফোন করে বড় ধরনের বিপত্তিতে পড়েছিলেন ফরিদ আহমদ নামের জনৈক ব্যক্তি। এমনকি সাহায্য প্রার্থীকে মোটা অংকের জরিমানা করেছিলেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসনের ভাষ্য, ফোন পেয়ে খাদ্যসহায়তা করতে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, ওই ব্যক্তির চারতলা বাড়ি রয়েছে এবং হোসিয়ারি কারখানার মালিক। তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাঁকে ৩৩৩ ফোন করে অযথা হয়রানি ও সরকারি সময় নষ্ট করার দায়ে মোটা অংকের জরিমানা এবং তা পরিশোধ করতে বাধ্য করেন।
পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, ফরিদ আহমেদের এক ছেলে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, দুই মেয়ে রয়েছে। তিনি একটি হোসিয়ারি কারখানায় পাঁচ-ছয় হাজার টাকা বেতনের কাজ করেন। ফরিদ আহমেদ তাঁর বড় মেয়ের স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে, চড়া সুদে ঋণ করে ও ধার করে জরিমান পরিশোধ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণিত হয় যে, ফরিদ আহমদ প্রকৃত পক্ষেই ত্রাণ পাবার যোগ্য ছিলেন। কিন্তু উপজেলা নির্বাহী অফিসার অহেতুক বিরাগের বশবর্তী হয়ে একজন বিপদাপন্ন মানুষকে বড় ধরনের সাজা দিয়েছেন। যা তার পেশাগত অসদাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দায়িত্বহীনতার পর্যায়ভূক্ত।
বগুড়ার আদমদীঘির ঘটনা পুরো জনপ্রশাসনকে জনগণের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে, জনউপদ্রপের অভিযোগে অভিযুক্ত করে ছাগলকে দণ্ড দেয়ার ঘটনায় আলোচনায় এসেছিলেন আদমদীঘির ইউএনও। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ছাগল ফুলগাছ খাওয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ছাগলকে জরিমানা করেছেন। ছাগল মালিকের অভিযোগ করেছেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে জরিমানা করে ছাগলটি স্থানীয় ইউএনও আটকে রাখার পর বিক্রি করে দিয়েছেন। যদিও বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে ইউএনও বলেছেন, জরিমানার টাকা দিয়ে মালিক ছাগলটি নিয়ে যেতে পারেন। তবে আইনসংশ্লিষ্ট লোকজনের ভাষ্য, ভ্রাম্যমাণ আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে হলে তাকে উপস্থিত থেকে দায় স্বীকার করতে হয়। পশুটিকে খোঁয়াড়ে দেওয়া ভালো সমাধান হতে পারতো মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু ইউএনও সে সোজা পথে অগ্রসর না হয়ে ছাগলকে শাস্তি দিয়ে নিজের ক্ষমতার পরিধি জানিয়ে দিয়েছেন। রসিকজনরা মনে করেন, ইউএনও নিজের ক্ষমতা হাজির করার কোন জায়গা না পেয়ে ছাগলের ওপর তা প্রয়োগ করেছেন।
ছাগল মালিক সাহারা খাতুন দাবি করেছেন, ছাগলটি হারিয়ে গেলে তিনি অনেক জায়গায় খুঁজেও ছাগলটি পাননি। পরে এলাকার লোকজন মাধ্যমে জানতে পারেন যে, ছাগলটি ইউএনওর এক নিরাপত্তাকর্মীর হেফাজতে আছে। ছাগল ফেরত আনার জন্য একাধিকবার ইউএনওর অফিস ও বাসায় গেলেও সাহারা বেগমকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় বলে তাঁর দাবি। তার অভিযোগ, তিনি মানুষের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন যে তাঁর ছাগলটি পাঁচ হাজার টাকায় ইউএনও বিক্রি করে দিয়েছেন। ইউএনওর বাসার গৃহকর্মী তাঁর বাসায় যান এবং তিন হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলেন। তিন হাজার টাকা কেন আনবেন, জানতে চাইলে সাহারাকে ইউএনওর গৃহকর্মী বলেন যে ছাগলটি পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করে জরিমানার দুই হাজার টাকা কেটে রাখা হয়েছে। ছাগল মালিক দাবি করেছেন, তাঁর ছাগলটি উন্নত জাতের, যার বাজারমূল্য প্রায় ১২ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইউএনও সীমা শারমিনের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ফুলগাছ খাওয়ায় জনউপদ্রপ আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দু’হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনেকবার ছাগলের মালিককে ডাকা হয়েছে, কিন্তু তিনি তা আমলে নেননি। এ কারণে সংশ্লিষ্ট আইনে দু’হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু ইউএনও’র এমন দণ্ড দেয়াকে বিধিসম্মত মনে করছেন না আইনজ্ঞরা। তারা এটিকে বেআইনী, ক্ষমতার অপব্যবহার, পেশাগত অসদাচার, আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেই মনে করছেন।
এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞের ভাষ্য হলো, কারো বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই সশরীরে উপস্থিত থাকতে হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দিতে পারেন, আবার দোষ স্বীকারও করতে পারেন। যদি দোষ স্বীকার করেন, তখন প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালত তাঁকে দণ্ড দিতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বা দোষ স্বীকার ছাড়া কোনোক্রমেই ভ্রাম্যমাণ আদালতে দন্ড দেওয়া আইনসম্মত নয়। আদমদীঘির ইউএনও বাগানের ফুলগাছ খাওয়ার জন্য মালিকের অনুপস্থিতিতে ছাগল আটক করে কোনো ধরনের দণ্ড দিয়ে থাকলে তা অবৈধ, বেআইনি, অনৈতিক ও অন্যায়। তারা বলছেন, জনউপদ্রপের অভিযোগ ছাগলের বিরুদ্ধে আনা যায় না। মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হলে ছাগল খোঁয়াড়ে রেখে নির্দিষ্ট জরিমানা আদায় করা যুক্তিযুক্ত ছিল।
এ বিষয়ে তদানীন্তন বগুড়ার জেলা প্রশাসকের বক্তব্য হতাশাব্যাঞ্জক। তার ভাষায়, আদমদীঘির ইউএনও কোনো বেআইনি কাজ করেননি। যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে জনউপদ্রপের অভিযোগ পেলে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে দণ্ড দিতেই পারেন। তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসন চত্বরে লাগানো ফুলবাগানে বারবার ছাগলটি উৎপাত করেছে। তাই জনউপদ্রব সৃষ্টির অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে অর্থদণ্ড দিয়েছেন ইউএনও। জরিমানার টাকা পরিশোধ না করায় ছাগল আটক করে রাখা হয়েছে। ইউএনও সবকিছু নিয়ম মেনেই করেছেন।
মালিকের অনুপস্থিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা যায় কি না, জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, সেখানে ছাগলের মালিক উপস্থিত ছিলেন কি না, এটা প্রমাণিত নয়। নানাজনে নানা কথা বলছেন। যেহেতু আইনজ্ঞরা বলছেন, ছাগলের মালিকের অনুপস্থিতি বা দোষ স্বীকার না করলে ভ্রাম্যমান আদালত কাউকে দন্ড দিতে পারেন না, আর জেলা প্রশাসক মহোদয় নিজেই নিশ্চিত নন যে, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার সময় অভিযুক্ত ছাগল মালিক উপস্থিত ছিলেন কি না ? তাই ইউএনও’র সাফাই গাওয়া তার পক্ষে মোটেই যৌক্তিক ও সঙ্গত হয়নি বরং তার এ বক্তব্যকে স্ববিরোধীতাই বলা যায়। তবে একথা ঠিক কোন আমলার অপরাধ অন্যকোন আমলা কখনো অপরাধ হিসাবে গণ্য করেন না বরং সে অপরাধকে ইতিবাচক কাজ হিসাবে গণ্য করা বা অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। আর এটা নাকি ‘ব্যংরোক্রেটিক ট্রাডিশন বা আমলাতান্ত্রিক ঐহিত্য’। যে দেশে অপরাধকে অপরাধ হিসাবে গণ্য না করে সাফাই গাওয়া যদি আমলাতান্ত্রিক ঐতিহ্য হয়, তাহলে সে দেশের সর্বনাশের কোন কিছুর বাকি আছে বলে মনে হয় না। যদিও স্থানীয় প্রশাসন পরবর্তীতে গোঁফ নামিয়ে দণ্ডিত ছাগল মালিকের কাছে ফেরৎ দিয়েছে। জরিমানার টাকা নাকি পরিশোধ করেছেন বিচারক নিজেই। বিষয়টি বিচারকের দণ্ড হিসাবে বিবেচনা করছেন সাধারণ মানুষ। বিষয়টি জনমনে হাস্যরসের সৃষ্টি করলেও জাতি হিসাবে আমাদেকে মোটেই সম্মনিত করেনি।
মূলত, জনপ্রশাসনের অধিক সংখ্যক কর্মকর্তাই সৎ, যোগ্য, চৌকস, মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান। তাই কোন আমলার স্বেচ্ছাচারিতা ও পেশাগত অসদাচারণের জন্য পুরো ব্যুরোক্রেসীকে দায়ি করার সুযোগ নেই। তবে যারা নিজেদের পদমর্যাদা ও দায়িত্বের প্রতি সুবিচার না করেই ক্ষমতার অপব্যবহার ও পেশাগত অসদাচার করছেন তাদের হাত থেকে পুরো ব্যুরোক্রেসীকে মুক্ত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। খোয়াড় থাকতে যে বিচারক ছাগলের ‘জনউপদ্রপ’ আইনে বিচার করেন তার যোগ্যতা, সততা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন কেউ তুলতেই পারেন। ‘ছাগলের জনউপদ্রপ’ বিষয়টি কি কৌতুললোদ্দীক নয়?
www.syedmasud.com