ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৯৭১ জন। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এ তথ্য জানিয়েছেন। গত বুধবার আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর অন্যতম। এর কম্পন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আশপাশের অঞ্চলজুড়েও অনুভূত হয়েছে। বিবিসি, আল জাজিরা , এএফপি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লা গুইরা অঙ্গরাজ্য। সেখানে বহু ভবন ধসে পড়েছে। পরিস্থিতিকে ‘দুর্যোগ এলাকা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। উদ্ধারকর্মীরা এখনও বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকেপড়াদের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে নিহত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৯৭১ জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে আটকাপড়ে থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিখোঁজের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে
ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় অন্তত ১১ হাজার মানুষ নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে এ সংখ্যা এখনো আনুষ্ঠানিক নয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার মানুষ চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
ভেনেজুয়েলায় অবস্থানরত এক সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়েছে এবং সড়কে বিশাল ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ছুটির সপ্তাহের কারণে ভূমিকম্পের সময় অধিকাংশ মানুষ নিজ নিজ বাড়িতেই ছিলেন।
রাজধানী কারাকাসে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এদিকে দেশটির একটি বিরোধী রাজনৈতিক জোট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অনলাইন লিংক চালু করেছে, যেখানে নাগরিকদের নিখোঁজ স্বজনদের তথ্য জানাতে বলা হয়েছে। সেই তালিকায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার মানুষ নিখোঁজ হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন।
তবে এই সংখ্যা শুধুমাত্র তাদেরই, যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পেরেছেন এবং নিখোঁজের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানাতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে প্রকৃত নিখোঁজের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
১৯০০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলায়
দেশটির ইতিহাসে ১২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প এটি।
নিখোঁজ রয়েছে হাজার হাজার মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে রাতের অন্ধকারেও অভিযান চালিয়েছেন। ভূমিকম্পের সময় নিজের ভবন থেকে প্রাণে বেঁচে বেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন রবার্তো গামাস নামের এক বাসিন্দা। তিনি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, “ভবনটি এক পাশ থেকে আরেক পাশে দুলছিল। দৃশ্যটি ছিল অবিশ্বাস্য।” তিনি বলেন, “সৌভাগ্যক্রমে ভবনটিতে তখন খুব বেশি মানুষ ছিল না। কিন্তু ভাবুন তো, যদি অনেক মানুষ থাকতো, তাহলে সবাই বের হওয়ার চেষ্টা করলে কী ধরনের আতঙ্ক তৈরি হতো!”
ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকারীরা ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে ঝুঁকি নিয়ে তল্লাশি চালান। অন্ধকারের মধ্যে তারা ভেঙে পড়া স্থাপনার ওপর উঠে জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন এবং ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধারে কাজ করেন। বিশেষজ্ঞদের তথ্যানুযায়ী, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই ভূমিকম্পটি ১৯০০ সালের পর ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে শক্তিশালী। এর আগে ১৯০০ সালের ২৯ অক্টোবর উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল।
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত ভেনেজুয়েলায় এমন শক্তিশালী কম্পন দেশটির অবকাঠামো ও জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর পরবর্তী সময়ে আরও আফটারশক বা পরাঘাতের আশঙ্কা থাকে, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সতর্কতা অব্যাহত রাখা জরুরি।
পাশে বিশ্বনেতারা
সহায়তার ঘোষণা বিভিন্ন দেশেরভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের পর দেশটির জনগণের প্রতি সংহতি ও সমর্থন জানিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা। একই সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতা ও মানবিক সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে কয়েকটি দেশ। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, তাদের স্বজন এবং উদ্ধারকাজে নিয়োজিতদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ভেনেজুয়েলার মানুষের প্রতি তার এবং স্পেনের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তিনি নিহতদের পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনাও জানান।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ভেনেজুয়েলাকে সহায়তার জন্য যা সম্ভব, তা করবে চীন। একই সঙ্গে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কোনো চীনা নাগরিক হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নাইয়িব বুকেলে জানিয়েছেন, তার দেশ থেকে ৩০০ উদ্ধারকর্মী ও প্যারামেডিক, পাশাপাশি ৫০ টন সরঞ্জাম, ওষুধ ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী কারাকাসে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ভেনেজুয়েলাকে দ্রুত সহায়তা দিতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে তিনি সরকারের সব সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সহায়তা এবং মানবিক ত্রাণ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
“উদ্ধার কার্যক্রমে নিয়োজিত ব্যক্তিদের
জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সময়”
ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের সময় শক্তিশালী আফটারশকের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন ভূকম্পবিদরা। তারা বলছেন, এই সময়টি উদ্ধারকর্মী ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়গুলোর একটি।
অস্ট্রেলিয়ার সিসমোলজি রিসার্চ সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী অ্যাডাম পাসকালে আল জাজিরাকে বলেন, ভেনেজুয়ায় শক্তিশালী আফটারশকের সম্ভাবনা সম্পর্কে সবাইকে অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে, বিশেষ করে যখন উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, “উদ্ধার কার্যক্রমে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময়।” পাসকালে জানান, আফটারশকের পাশাপাশি আগের ভূমিকম্পগুলোর সমান কিংবা আরও বড় মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে কয়েক দিন পেরিয়ে গেলে এমন সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে পরবর্তী কম্পনে সেগুলো আরও ধসে পড়তে পারে, যা উদ্ধারকাজকে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে।
‘মনে হচ্ছিল, পুরো ভবনটি মাথার ওপর ভেঙে পড়বে
পরপর শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পের আঘাতে ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ১০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ দুর্যোগের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার ভূমিকম্পে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প এটা। মনে হচ্ছিল, পুরো ভবন মাথার ওপর ভেঙে পড়বেÍ। তিনি বিবিসির মুন্দোতে (স্প্যানিশ ভাষার সংবাদ বিভাগ) কাজ করেন। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার পর যখন শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে তখন কোলস্টার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সপ্তম তলায় ছিলেন। কারাকাসের মধ্যাঞ্চলের পালোস গ্রান্দেসে ভবনটি অবস্থিত।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে নিকোল বলেন, ‘আমি দেখলাম, জানালাগুলো নড়ছে। ওই সময় সামনের দরজা আর একটি পাথরের দেয়ালের মাঝে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আমার মাথায় আর কিছুই আসেনি। দেয়ালটা মজবুত বলে মনে হয়েছিল।’ একপর্যায়ে নিকোলের প্রতিবেশীরা চিৎকার করতে করতে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। তখন তিনিও ঘরের বাইরে আসেন। কারাকাসের পূর্বাঞ্চলে ছিলেন আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী কোরো মার্তিনেজ। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের সময় ‘বিকট শব্দ’ হয়েছিল। ৫৬ বছর বয়সী এ নারী বলেন, ‘ঘরে জিনিসপত্র, এমনকি ফ্রিজের ভেতরে থাকা জগগুলোও একের পর এক পড়ে গেল। আমি আগে কখনো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি।’
এর আগে ১৯৬৭ সালে কারাকাসে এমন শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনে অবসরে যাওয়া মারিয়া রোমেরো নামের একজন বলেন, ‘এবারেরটা ওই ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়াবহ ছিল।’ আমি দেখলাম, জানালাগুলো নড়ছে। ওই সময় সামনের দরজা আর একটি পাথরের দেয়ালের মাঝে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আমার মাথায় আর কিছুই আসেনি। দেয়ালটা মজবুত বলে মনে হয়েছিল।
জোড়া ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। তবে অল্প সময় পরই তা তুলে নেয় কর্তৃপক্ষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে কারাকাসে ব্যাপক ধ্বংসের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। বহু ভবন ধসে পড়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। হাসপাতালগুলোতে আহত ব্যক্তিরা ভিড় করছেন। কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে বিদ্যালয় ও রেলসেবা। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে কারাকাসে ব্যাপক ধ্বংসের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। বহু ভবন ধসে পড়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। হাসপাতালগুলোতে আহত ব্যক্তিরা ভিড় করছেন। কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে বিদ্যালয় ও রেলসেবা। কারাকাসের পূর্বাঞ্চলের চাকাও–এর মেয়র গুস্তাভো দুকে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এখানে দুটি স্থাপনা ভেঙে পড়েছে। প্রাথমিকভাবে তিনজন নিহত ও ১৬ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মেয়র বলেন, ‘আমরা যত বেশি সম্ভব মানুষকে উদ্ধার করতে সাধ্যমতো সবকিছু করব।’
ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেল্লো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘আমাদের অনেক ভবন ও বাড়িঘর ধসে পড়েছে। নিরাপত্তা ও বেসামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে আমাদের কাছে যা কিছু আছে, সব দিয়েই আমরা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছি। দমকল-পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’ ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, কারাকাসে ১৮১২ সালে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল। ওই ভূমিকম্পে মারা যান প্রায় ৩০ হাজার মানুষ।
কেঁপেছে ব্রাজিল-কলম্বিয়াও
শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে যখন ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস কেঁপে উঠেছে, তখন লাতিন আমেরিকার অন্য দুই দেশ ব্রাজিল ও কলম্বিয়া থেকেও তা টের পাওয়া গেছে। জোড়া ভূমিকম্পের পর অন্তত ২০টি পরাঘাতের কথা জানান ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, ‘আজ (বুধবার) সন্ধ্যা ৬টার দিকে পরপর দুটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। প্রথমটির তীব্রতা ৭ দশমিক ২। অন্যটি ৭ দশমিক ৫। এরপর অন্তত ২০টি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে।’
ভেনেজুয়েলার জোড়া ভূমিকম্পে কেঁপেছে ব্রাজিল ও কলম্বিয়া। ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়ে জানায়, দেশটির কিছু অংশে ভূকম্পন টের পাওয়া গেছে। সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলায় কোনো ব্রাজিলীয় নাগরিকের হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে ২ হাজার ১০০ কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত রয়েছে। কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা থেকেও ভূকম্পন টের পাওয়া গেছে।
জোড়া ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। তবে অল্প সময় পরই তা তুলে নেয় কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে কারাকাসে ব্যাপক ধ্বংসের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। বহু ভবন ধসে পড়েছে। ইউএসজিএস বলেছে, পরপর শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পের আঘাতে ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। ১০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ দুর্যোগের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
দেলসি রদ্রিগেজ ভাষণে বলেন, জোড়া ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত কারাকাসের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বন্ধ আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রেলসেবা। কারাকাসে উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন দেলসি রদ্রিগেজ।
কেন এই ভূমিকম্প
ভেনেজুয়েলা সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকানÍএ দুটি টেকটোনিক প্লেট মিলিত হয়েছে। ইউএসজিএসের জরিপ অনুযায়ী, গতকালের ভূমিকম্প দুটির মধ্যে দ্বিতীয়টি ও সবচেয়ে বড়টি (৭ দশমিক ৫ তীব্রতার) এ প্লেটগুলোর সীমানার কাছে ‘শেলো স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্টিংয়ের’ ফলে ঘটেছে। এটি তখন ঘটে, যখন প্লেটগুলোর মধ্যবর্তী ফাটলগুলো আনুভূমিকভাবে সরে যায়। এমন নড়াচড়া দ্রুত ঘটলে ভূমিকম্প হয়।
গতকালের জোড়া ভূমিকম্প সম্ভবত ‘একটি জটিল, ফাটলের পারস্পরিক ক্রিয়াপ্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়’ বলে জানিয়েছে ইউএসজিএস। পরাঘাতের (এর মধ্যে বেশ কিছু বড় তীব্রতার) শঙ্কার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
জামায়াতের শোক : ভেনেজুয়েলায় স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোরে সংঘটিত ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে বহু মানুষের প্রাণহানি, আহত ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সংবাদে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
গতকাল বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই শোক প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে তিনি নিহতদের যথাযথ মর্যাদা কামনা এবং নিহতদের পরিবার-পরিজন ও আহতদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করেন।
গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, ভেনেজুয়েলার জনগণ আজ এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। আমরা তাদের এই দুঃসময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা প্রদান ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদারে এগিয়ে আসার জন্য ভেনেজুয়েলার সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমরা আশা প্রকাশ করছি ভেনেজুয়েলার সরকার ও জনগণ শীঘ্রই তাদের এই কঠিন বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন।