ব্যবহার করা হবে বিভিন্ন এআই টুলসও
মুহাম্মদ নূরে আলম
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে দিতে এবং ‘সুনীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনে বঙ্গোপসাগরে নামছে আন্তর্জাতিক মানের এক বিশাল ও অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজ। অত্যাধুনিক এই গবেষণা জাহাজে ব্যবহার করা হবে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন টুলস। ফলে গবেষণার আওতায় আসছে ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের বিশাল ‘এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন’ (যা উপকূল থেকে প্রায় ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত) জুড়েই লুকিয়ে আছে দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার মতো বিপুল সম্ভাবনা। প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ডে তৈরি হতে যাওয়া এই বিশেষায়িত ভাসমান গবেষণাগারটির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা নিজস্ব সক্ষমতায় গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে জ্বালানি, গ্যাস হাইড্রেট ও মূল্যবান খনিজ সম্পদের নিখুঁত তথ্য অনুসন্ধান করতে পারবেন। ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে জাহাজটি বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট (বোরি)-এর বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট (বোরি)-এর সূত্রে এইসব তথ্য জানা যায়। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান সরকারি দল বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে সুনীল অর্থনীতি ও সমুদ্র সম্পদ রক্ষা অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে স্থান পেয়েছিল। সম্প্রতি কক্সবাজার সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সমুদ্র অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর প্রশাসনের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম প্রধান অতিথি হিসেবে খুলনা শিপইয়ার্ডে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে এক নতুন শক্তির জোগান দেবে।
সমুদ্র ও ব্লু-ইকোনমি গবেষকরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে লুকিয়ে থাকা বিপুল সম্পদ এ যাবৎকাল বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের নাগালের বাইরেই রয়ে গিয়েছিল। ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই ভাসমান গবেষণাগারটি কেবল একটি জাহাজ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক সার্বভৌমত্বের এক নতুন প্রতীক। নিজস্ব প্রযুক্তিতে গভীর সমুদ্রের খনিজ ও জ্বালানি উত্তোলনের পথ সুগম করার মাধ্যমে এই প্রকল্পটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের টেকসই সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
সূত্রে জানাযায়, আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রাখতে এই বিশেষায়িত গবেষণা জাহাজের নকশা প্রস্তুত করেছে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক জাহাজ নির্মাণ বিষয়ক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘কিল মেরিন’। কুয়েত এনভায়রনমেন্টাল এজেন্সির ব্যবহৃত একটি সফল গবেষণা জাহাজের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এই নতুন নকশাটি তৈরি করা হয়েছে। ১৬০ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পের ভেতরের উচ্চ প্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও আধুনিক সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নজাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াচীন, তুরস্ক ও সিঙ্গাপুরের মতো বিশ্বের উন্নত দেশগুলো থেকে।
খুলনা শিপইয়ার্ডের সাথে চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে এই মূল জাহাজটি প্রস্তুত হওয়ার পাশাপাশি সমুদ্রের অগভীর উপকূলীয় এলাকা ও মোহনায় দ্রুত নমুনা সংগ্রহের জন্য ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যের দুটি উচ্চগতির স্পিডবোটও তৈরি করা হচ্ছে, যা আগামী এক বছরের মধ্যে বোরির হাতে হস্তান্তর করা হবে।
ট্রলারের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে গভীর সমুদ্রে ‘৩ বিশেষায়িত ল্যাব’: ২০১৬ সালে সমুদ্রবিদ্যার ছয়টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট (বোরি)-এর বিজ্ঞানীদের এতদিন সাগরের নমুনা সংগ্রহের জন্য সাধারণ মাছ ধরার ট্রলার কিংবা বিদেশী জাহাজের ওপর নির্ভর করতে হতো। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের বাইরে গভীর সমুদ্র বা সমুদ্রতল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালানো সম্ভব হতো না। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে নতুন জাহাজে থাকছে ৩টি সর্বাধুনিক বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি। যেমন: ১. ওয়েট ল্যাব ২. ড্রাই ল্যাব ৩. ডেটা বিশ্লেষণ ল্যাব। এর ফলে সমুদ্র থেকে সংগৃহীত নমুনা মাঝসাগরেই তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করা যাবে এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে সেই গবেষণার তথ্য সরাসরি মূল ডেটা সেন্টারে পাঠানো সম্ভব হবে। এই জাহাজে একসঙ্গে ২৩ জন বিজ্ঞানী ও ক্রু সদস্য অবস্থান করে টানা ৮ থেকে ১০ দিন সমুদ্রে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।
সূত্রে আরও জানাযায়, জাহাজটিতে যুক্ত হতে যাওয়া আধুনিক প্রযুক্তি; যেমন: সাব-বটম প্রোফাইলার, মাল্টি-বিম ইকো সাউন্ডার এবং সাইড-স্ক্যান সোনার-এর সাহায্যে সমুদ্রতলের নিচের স্তরের নিখুঁত ছবি ও ভূ-তাত্ত্বিক গঠন নির্ণয় করা যাবে। বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনে (ইইজেড) লুকিয়ে থাকা বিপুল গ্যাস হাইড্রেট এবং মূল্যবান খনিজ সম্পদের অবস্থান ও সম্ভাবনা সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গেম-চেঞ্জার হবে। সাগরের নিচে জমে থাকা পলি, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর নমুনা বিশ্লেষণ করে অতীতের জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস এবং সমুদ্রের কার্বন সংরক্ষণের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করা যাবে। এই বিশাল উদ্যোগকে কার্যকর করতে কক্সবাজারের খরুশকূলে মহেশখালী চ্যানেল এলাকায় পন্টুন, জেটি ও গ্যাংওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে, যা জাহাজটির মূল নোঙর স্টেশন হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) পরিবেশ ওশানোগ্রাফি ও জলবায়ু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, প্রচলিত দেশীয় নৌযানের সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে আমাদের সামুদ্রিক পরিবেশগত গবেষণাগুলো মূলত উপকূলের কাছাকাছি এবং অগভীর পানিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে সাগরের ওপরের স্তরের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা বা দৃশ্যমান দূষণ পর্যবেক্ষণের বাইরে বড় কোনো অনুসন্ধান চালানো সম্ভব হয় না। বোরির এই নতুন গবেষণা জাহাজের (রিসার্চ ভেসেল) মাধ্যমে আমরা প্রথমবারের মতো গভীর সমুদ্র, সমুদ্রতল এবং সাগরের বিভিন্ন গভীরতার পানির স্তরে নিখুঁত গবেষণা চালাতে পারব। এটি সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও সুনীল অর্থনীতি (ব্লু-ইকোনমি) উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) মহাপরিচালক কমডোর শেখ শাহীদ আহমেদ দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, বঙ্গোপসাগরের বুকে বাংলাদেশের জলসীমা এখন আর কেবল ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার ক্ষেত্র নয়। ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের বিশাল ‘এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন’ (যা উপকূল থেকে প্রায় ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত) জুড়েই লুকিয়ে আছে দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার মতো বিপুল সম্ভাবনা। এই অপার ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ এবার প্রবেশ করছে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে জ্বালানি, গ্যাস হাইড্রেট ও মূল্যবান খনিজ সম্পদের নিখুঁত তথ্য অনুসন্ধানের জন্য দেশেই তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের এক বিশেষায়িত মেগা গবেষণা জাহাজ। এইসব গবেষণায় এআই প্রযুক্তিরও সহযোগীতা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট (বোরি)-এর জন্য এই ভাসমান গবেষণাগারটি তৈরি করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান খুলনা শিপইয়ার্ড। পুরো প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা। জাহাজটির নির্মাণ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও নকশার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। বোরি ও খুলনা শিপইয়ার্ডের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ সালের জুন মাসের মধ্যে এই ভাসমান গবেষণাগারটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে বোরির বহরে যুক্ত হবে। তখন তা কেবল সমুদ্রের গুপ্তধনই খুঁজবে না, বরং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। মূল জাহাজের পাশাপাশি সমুদ্রের অগভীর উপকূলীয় এলাকা ও মোহনায় দ্রুত যোগাযোগের জন্য দুটি ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যের উচ্চগতির স্পিডবোট তৈরি করা হচ্ছে, যা আগামী এক বছরের মধ্যে বোরির বিজ্ঞানীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এগুলো মূল জাহাজে রসদ সরবরাহ, জরুরি উদ্ধারকাজ এবং দ্রুত নমুনা সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হবে।