তিস্তার বুক চিরে উত্তরবঙ্গে নতুন বিপ্লবের অপার সম্ভাবনা

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনায় সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জোরালো আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। ঢাকার অনুরোধের ভিত্তিতেই বেইজিং এই বৃহদায়তন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে যুক্ত হতে যাচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৌশলগত প্রবেশদ্বার ‘শিলিগুড়ি করিডোর’-এর কাছাকাছি এই মেগা প্রকল্পের অবস্থান হওয়ায়, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং ভারতের গভীর পর্যবেক্ষণকে পাশ কাটিয়ে এটি বাস্তবায়ন করা বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্য এক মস্ত বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন ভূ-রাজনীতি ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রায় এক লক্ষ ৭১ হাজার হেক্টর জমি কৃষিকাজের উপযোগী হবে। পরিবেশ রক্ষায় ১১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী অববাহিকার উভয় পাশে সামাজিক বনায়ন তৈরি করা হবে। ৭ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্ভাব্য প্রায় ৯৮৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্পে অর্থনৈতিক রিটার্ন আয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বা ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ সংক্রান্ত চীন সরকারের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না-এর তৈরি করা মূল সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন বা ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রে এইসব তথ্য জানাযায়। মূল সমীক্ষা অনুযায়ী, নদী শাসনের মাধ্যমে তিস্তার চওড়া প্রস্থ কমিয়ে ১ থেকে ১.৫ কিলোমিটারে আনা হবে। এর ফলে নদীর দুই পাশে বালুচরে পরিণত হওয়া ১ লক্ষ ৭০ হাজার ৮৭০ হেক্টর (প্রায় ১৭০.৮৭ বর্গকিলোমিটার) জমি পুনরুদ্ধার করে কৃষিকাজে ব্যবহার উপযোগী করা হবে। শুষ্ক মৌসুমে উত্তরবঙ্গের রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার যে ৫ লক্ষ ৪২ হাজার হেক্টর এলাকা পানির অভাবে মরুভূমিতে রূপ নেয়, প্রকল্পের আওতায় ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ ড্রেজিং ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের মাধ্যমে সৃষ্ট কৃত্রিম জলাধারের পানির সাহায্যে সেখানে শতভাগ সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন নির্দেশিকার সূত্রে জানাযায়, নদীর দুই তীর ঘেঁষে ভাঙন রোধ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ১১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী অববাহিকার উভয় পাশে গড়ে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকা জুড়ে সামাজিক বনায়ন ও ফলের বাগান (সবুজ বেষ্টনী) গড়ে তোলা হবে।

বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন এবং পাওয়ার চায়না ইকোনমিক ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস উইং এর সূত্রে জানাযায়, প্রকল্প এলাকার অভ্যন্তরে আবাসন প্রকল্প, ইপিজেড, টেক্সটাইল মিল ও বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৭ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হবে। প্রকল্পের ফিজিবিলিটি রিপোর্টের বিশেষ শর্ত অনুযায়ী, প্রাথমিক নির্মাণ ও নদী খনন কাজের অন্তত ৩০% শ্রমশক্তিতে স্থানীয় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন মানুষ এবং নারীদের নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়াও নদীর দুই তীরে আধুনিক মেরিন ড্রাইভ রোড, কৃত্রিম লেক, স্যাটেলাইট টাউন, পর্যটন রিসোর্ট এবং বিনোদন পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই ওয়াটার ট্যুরিজম পুরোপুরি চালু হলে প্রতি বছর পর্যটন ও সেবা খাত থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় বর্তমান মূল্যে প্রায় ৬০০ থেকে ৮৪০ কোটি টাকা) অর্থনৈতিক রিটার্ন বা আয় আসবে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিজাইন ও প্ল্যানিং উইং কর্তৃক প্রকাশিত ‘তিস্তা ব্যারাজ ও নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নির্দেশিকা’ অনুযায়ী, মৎস্য ও কৃষি খাতে বার্ষিক আয় মোট অর্থনৈতিক সুবিধার প্রায় ৯৮৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদে মোট অর্থনৈতিক রিটার্ন ধরা হয়েছে ২.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা)। আধুনিক সেচ ও পুনরুদ্ধারকৃত জমিতে উন্নত জাতের ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষি খাতে বার্ষিক অতিরিক্ত আয় বৃদ্ধি পাবে প্রায় ১,৫৭০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা)। নদীর গভীরতা ১০ মিটারে উন্নীত করার ফলে শুষ্ক মৌসুমেও পানি থাকবে। এতে দেশীয় সুস্বাদু মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হবে, যা থেকে মৎস্য খাতে বার্ষিক অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার মৎস্য সম্পদ আহরণ ও বাজারজাত করা সম্ভব হবে।

সূত্রে জানাযায়, চীনের ‘অল-আউট’ প্রস্তাবতিস্তা নদীর অববাহিকা পুনরুদ্ধার এবং উপকূল ব্যবস্থাপনায় চীন তার আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনার শুরু থেকে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে কারিগরি সহায়তা দেবে চীন। অর্থাৎ প্রাথমিক সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণ ও সামগ্রিক বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যুক্ত হতে আগ্রহী চীন। গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই, ২০২৬) ঢাকায় চীনা দূতাবাসে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং পরবর্তীতে বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন স্পষ্ট করেছেন যে, এই প্রকল্পটির সাথে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। চীন স্রেফ বাংলাদেশের অনুরোধে এবং দুই দেশের অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতেই এখানে কাজ করতে চায়; এর পেছনে অন্য কোনো গোপন পলিটিক্যাল এজেন্ডা বা ‘তৃতীয় পক্ষকে’ লক্ষ্য করার কোনো উদ্দেশ্য বেইজিংয়ের নেই।

তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নতুন সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি: তিস্তা নদী নিয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অধরাই রয়ে গেছে। ক্ষমতাচ্যুত পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চুক্তি সইয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালেও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তীতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার চীনের মাধ্যমে তিস্তায় কিছু সমীক্ষা করালেও ভারতের কৌশলগত আপত্তির মুখে বেইজিংকে নিয়ে আর সামনে এগোয়নি। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নকে তাঁর সরকারের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সরকার গঠনের পর তাঁর প্রথম চীন সফরে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক করিডোর এবং এই স্পর্শকাতর তিস্তা প্রকল্পের বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, যা জানুয়ারিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)-এর মাধ্যমে আরও একধাপ এগিয়ে গেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সরকারের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা একাধারে একটি বৃহৎ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি এবং উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার অপরিহার্য হাতিয়ার।

ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ: তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের বর্তমান নীতি এবং কৌশলগত মহলে এক ধরণের গভীর অস্বস্তি ও তীব্র নজরদারির পরিবেশ বিদ্যমান। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে তিস্তা নদীটি ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’-এর একদম কাছাকাছি অবস্থিত। এই করিডোরটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সংযুক্ত করেছে। ফলে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারের এত সন্নিকটে চীনের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি ভারত মেনে নিতে পারছে না আবার তারা তিস্তা চুক্তিও বাস্তবায়ন করছে না? কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই ধরনের উদ্বেগ অগ্রহণযোগ্য। যদিও ভারত সরকার এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, প্রতিবেশী অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান পদচারণা ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্য ও নিরাপত্তার জন্য একটি পরোক্ষ চ্যালেঞ্জ।

চীন-ভারতের ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. মো: নজরুল ইসলাম বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার এই পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং তিস্তা প্রকল্পকে ঘিরে তৈরি হওয়া জটিল সমীকরণ নিয়ে নানান আলোচনা চলছে। তিস্তা প্রকল্প এখন আর কেবলই কোনো সাধারণ নদী উন্নয়ন বা সেচ কর্মসূচি নয়। এটি মূলত একটি ত্রিমুখী আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে একদিকে রয়েছে চীন বনাম ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই, অন্যদিকে রয়েছে চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্রের বৈস্মিক ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন। এর বাইরে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো আঞ্চলিক উপ-সমীকরণগুলোও ক্রিয়াশীল। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বর্তমান সরকার এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে যে রাজনৈতিক সাহসিকতা দেখাচ্ছে, তাকে সফল করতে হলে অত্যন্ত বিচক্ষণ কূটনীতির প্রয়োজন। ভারতকে সরাসরি চটিয়ে বা তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে এই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার মডেলে রূপান্তর করতে হবে।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সাহাবুল হকের মতে, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ২০২৬ সালের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশ তার জাতীয় উন্নয়ন ও কৃষির স্বার্থে যেকোনো আন্তর্জাতিক দেশের সহায়তা নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখে। তবে তিস্তা অববাহিকায় যেকোনো বড় ধরনের ভূ-প্রকৃতি পরিবর্তন বা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মতো প্রকৌশলগত কাজ করার আগে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উচিত উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, যার চাবিকাঠি ভারতের হাতে। তাই বেইজিংয়ের অর্থ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি নয়াদিল্লির সাথে সমান্তরালভাবে পানিবণ্টন বা পানি প্রবাহের টেকনিক্যাল সংলাপ চালু রাখা অত্যন্ত জরুরি।